অর্থনৈতিক অপরাধ থেকে অর্জিত আয় বৈধ করার সুযোগ অনৈতিক খুব বেশি সুফলও আমরা পাই না

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া অনৈতিক পদক্ষেপ। এ থেকে খুব বেশি সুফলও আমরা পাই না। তার পরও সরকার এমন সুযোগ দেয় কোনো কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য। কেউ হয়তো চায়।

ড. ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশের অন্যতম আর্থ-উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য প্রস্তাবিত বাজেট ঘিরে প্রতিক্রিয়া এবং সরকারের চ্যালেঞ্জ, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বহুমুখী সংকট রয়েছে। বিদ্যমান সংকটের সঙ্গে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও যুক্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী কী দেখছেন?

অর্থনীতিতে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিন বছর ধরেই অর্থনীতির নানা সূচকের মধ্যে নিম্নমুখী ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে সম্প্রতি অনেক সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো সূচকের পতন আটকানো গেলেও অবস্থান শক্তিশালী করা যায়নি। সেজন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতির হার আড়াই বছর ধরে ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বর্তমানে এ হার কিছুটা কমে এলেও তা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ হার কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি যারা বর্তমানে শ্রমবাজারে নিয়োজিত, তাদের স্বস্তির জন্যও কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ যে হারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, সে হারে তাদের মজুরি বাড়েনি। আর যারা একেবারেই শ্রমবাজারের অন্তর্ভুক্ত নয় বা হতদরিদ্র, তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো জরুরি।

সরকারের দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় কর্মসংস্থান একেবারেই নগণ্য। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটা অন্যতম ভিত্তি ছিল কর্মসংস্থানের অভাব। এক্ষেত্রে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। একদিকে সরকারি খাতে কর্মসংস্থানের পরিমাণ মোট চাহিদার ৫-৬ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যক্তি খাতে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি নেই। কারণ এ খাতে বিনিয়োগ ১০-১১ বছর ধরে এক ধরনের স্থবির অবস্থায় রয়েছে। জিডিপিতে এর পরিমাণ প্রায় ২৪ শতাংশ। অথচ অর্থনীতিতে গতিময়তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাইলে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের পরিমাণ অন্তত ৩০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া দরকার। এটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য।

এর বাইরে কর-জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধিও একটি চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ রাজস্ব বা অর্থ দরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে, সেখানে আমাদের কর-জিডিপির হার খুবই কম, ৮ শতাংশের নিচে। সেটা না বাড়লে উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজস্ব আয় কম হলে সরকারি খাতেও কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হবে না।

এসব চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে বাজেট চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। বাজেটে অর্থ বরাদ্দ, করছাড়, প্রণোদনা ইত্যাদি নানা ধরনের আর্থিক পদক্ষেপ থাকবে। এগুলোর জন্য কিছু নীতিমালা দরকার। বিশেষত প্রয়োজন খাতওয়ারি কিছু নীতিমালা প্রণয়ন। কেননা বর্তমানে মধ্যমেয়াদি বা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নেই। আর নিশ্চিতভাবেই সরকারের আরো কিছু সংস্কার পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এজন্য আগে জানতে হবে অর্থনৈতিক কাঠামো কেন দুর্বল থেকে দুর্বলতর বা ভঙ্গুর হয়েছে। সে মোতাবেক আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে।

আমাদের বড় সংকট রয়েছে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা নিয়ে। বেসরকারি খাতে বর্তমানে ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবাহ কম। অন্যদিকে বাড়তি সুদের কারণে ব্যবসার ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী। ব্যাংক স্প্রেড ৬ শতাংশের কাছাকাছি বর্তমানে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হবে?

ব্যাংক স্প্রেড বৃদ্ধির অর্থ হলো, দেশের ব্যাংকগুলোয় আমানতের সুদহারের চেয়ে ঋণের সুদহার বেশি। ব্যবসায়িক ব্যয়ের সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাড়তি সুদহারের পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণ, যেমন জ্বালানি সংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য, ঋণ না পাওয়া এসব ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়েছে। আবার সুদহার বাড়ানোর অন্যতম কারণ মূল্যস্ফীতি হ্রাস। যদিও মূল্যস্ফীতি কমেনি। এছাড়া কিছু কাঠামোগত সমস্যা আমাদের আছেই। যেমন দুর্বল অবকাঠামো, অনুন্নত সড়কপথ। এছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঘুস-দুর্নীতি এসব সমস্যা রয়েই গেছে।

সামগ্রিকভাবে আগে থেকে বিদ্যমান ও নতুন কিছু সমস্যা বিনিয়োগের পরিস্থিতি প্রতিকূলে নিয়ে গেছে। শিল্প-কারখানার উৎপাদনও বাড়ছে না। সুতরাং এ রকম অবস্থায় কর্মসংস্থান বাড়বে না এমনটাই স্বাভাবিক। বাজেটে তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেয়া দরকার।

বর্তমানে মানুষের মধ্যে জন্মানো ক্ষোভের অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, আয় না থাকা। এসব কারণে সাধারণ মানুষের জীবন চরম সমস্যায় নিমজ্জিত। যারা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন, তাদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ব্যবসায় ব্যয় বাড়ার ফলে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন, কেউ ছোট পরিসরে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। সব মিলিয়ে আমাদের সামনে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

এসব প্রতিবন্ধকতা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

খুব দ্রুত উত্তরণের উপায় নেই। এসব প্রতিবন্ধকতা অনেক কিছুর সমন্বয়ে সৃষ্ট। এজন্য আমাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ লাগবে। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ মূলত বাজেটের মাধ্যমে এক অর্থবছরের জন্য নেয়া হয়। এছাড়া কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। সব সরকারই তা করে। সেগুলো হলো উৎপাদন খাতে ব্যয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), অবকাঠামো তৈরি ইত্যাদি। এগুলোও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়, তখন ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের উপকার হয়। যেমন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়। এটা স্বল্প সময়ে, এক বছরের মধ্যেই করা যায়। তারপর মধ্যমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ সম্মেলনও একটা পদক্ষেপ। কিন্তু বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য মূলত প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, নীতির ধারাবাহিকতা, নীতির সহজীকরণ, নীতির প্রয়োগ। অর্থাৎ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক, আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিকে সহজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, দেশের বিনিয়োগ নীতিমালা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ সুবিধাজনক। কারণ সেখানে উল্লেখ আছে, বিনিয়োগকারীরা মুনাফা প্রত্যাবাসন করতে পারবেন। এছাড়া তাদের জন্য বিশেষ কর সুবিধাও আছে। কিন্তু বাস্তবে মুনাফা প্রত্যাবাসনের জন্য দেশে যথেষ্ট পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আছে কিনা সেটা বড় প্রশ্ন। আবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি যদি খারাপ অবস্থায় থাকে, তখন নিশ্চয় আমরা চাইব না যে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাক। অর্থাৎ বিনিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে বাস্তবতা মিলছে না। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে এ ধরনের মৌলিক বাধাগুলো দূর করতে হবে। সেগুলো না করে কেবল সম্মেলন করে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যাবে না। তবে সম্মেলন করে এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা দেয়া হয় যে বাংলাদেশে কত বড় বাজার আছে এবং কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে। কিন্তু এসবের পূর্বশর্ত হলো নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের স্থিতিশীলতা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যেকোনো বিনিয়োগকারীরাই এসব ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করেন। কারণ বিনিয়োগ থেকে মুনাফা এক বছরে পাওয়া যায় না। এজন্য পাঁচ থেকে ১০ বছরও চলে যায়। ব্যবসা ভালোভাবে পরিচালনার জন্য সার্বিক স্থিতিশীল পরিবেশ খুবই দরকার।

সব মিলিয়ে ছোট ছোট উদ্যোগ স্বল্প সময়ের মধ্যেই করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। তারপর কিছু মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করা যায়। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ মানে হলো, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা যেটা বর্তমানে নেই। আমরা জ্বালানির জন্য আমদানিনির্ভর হয়েছি, চড়া দামে এলএনজি কিনে থাকি, যার চাপ পড়েছে রিজার্ভের ওপর। এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে জ্বালানি খাতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলনের পথ খুঁজতে হবে। সেজন্য আবার বিনিয়োগ লাগবে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা হবে মধ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। পরবর্তী সময়ে এটা সাহায্য করবে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে। এটা বিভিন্ন ধাপে করতে হবে।

আমাদের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন ধাপে কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে করা। কারণ একেক সরকার এসে নতুন নীতিমালা তৈরি করলে ধারাবাহিকতা বিনষ্ট হয়। নীতির ধারাবাহিকতা যে কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে হয়, এমন নয়। এক শাসনামলেও বহুবার ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করতে নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে নীতি ধারাবাহিকতা বিনষ্ট করা হয়। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে নজর রাখতে হবে।

নীতির ধারাবাহিকতা বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আলাপে নির্বাচনের প্রসঙ্গ চলে আসে। সম্প্রতি এ নিয়ে আমরা উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও দেখেছি। কবে নির্বাচন হবে বা কতটা দীর্ঘায়িত হবে তা আমরা জানি না। ততদিন পর্যন্ত কি দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এমনই থাকবে? কীভাবে আমরা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারি?

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন, মানববন্ধন হতে দেখছি আমরা। বেশির ভাগ আন্দোলন হচ্ছে সড়ক অবরোধ করে। এতে চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব চিত্র বিনিয়োগকারীরাও দেখছেন। এমন পরিস্থিতিতে সবার ভেতরে আতঙ্ক কাজ করছে। অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের নয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও এগুলো চলমান রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি—দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে এবং তারা সংঘবদ্ধ হয়ে এক দাবি থেকে অন্য দাবিও উত্থাপন করছে।

এসব সংকটের সমাধান হওয়া দরকার। কারণ এগুলোর সমাধান ছাড়া অর্থনৈতিক সমস্যা ঘনীভূত হবে এবং এতে রাজনৈতিক সমস্যা সামনে আরো ঘনীভূত হবে। পৃথিবীর সব দেশের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য যে অর্থনৈতিক সমস্যা ঘনীভূত হলে এর আগে বা পরে কোনো সরকারই বেশি দিন টিকতে পারে না। এর একটা অন্যতম উদাহরণ বাংলাদেশ। গত দেড় দশকে একজন স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন। সে সময় অর্থনৈতিক অবস্থা তাদের অনুকূলে গেলেও মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছে। এরপর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। গণ-অভ্যুত্থানে এত মানুষ যোগ দিল কেন? কারণ সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত ছিল। এ রকম অবস্থায় পৃথিবীতে অনেক সরকার থেকেছে, ২০ বা ৩০ বছর। অবস্থায় থেকে সেসব সরকার তাদের দেশের সার্বিক অগ্রগতি করতে পারেনি। তাদেরকেও চলে যেতে হয়েছে। আমরা এ রকম অবস্থার মধ্যে থাকতে চাই না। মানুষের মধ্যে যখন অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাবে, চাহিদা থাকবে, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে না। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে আমরা একটা দুষ্ট চক্রের মধ্যে আবর্তিত হব।

এ বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার বিধান রাখা হয়েছে। যদিও এবার কিছু ক্ষেত্রে হয়তো পরিবর্তন আনা হয়েছে। তারপর এ বিধানের প্রয়োজন কি রয়েছে?

যেকোনো সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রাজস্ব আহরণ করা। যদিও আমাদের দেশ রাজস্ব আহরণের হারে পিছিয়ে রয়েছে। সেজন্য সরকারের ওপর চাপও রয়েছে। কারণ বিপুল জনসংখ্যার দেশে উন্নয়নকাজ করা, জনগণের সামাজিক চাহিদা পূরণ করা বেশ কঠিন কাজ। এদিকে প্রতি বছর আমাদের বাজেট ঘাটতি থাকে অনেক। এ ঘাটতি পূরণের জন্য অভ্যন্তরীণ খাত তথা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয় কিংবা সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে হয়। তার পরও রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক থেকে যায়। বর্তমানে আমরা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় আছি। সেই ঋণপ্রাপ্তির জন্য অনেকগুলো শর্ত ছিল, যার মধ্যে একটি হলো, প্রতি বছর দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর আহরণ বাড়াতে হবে। যদিও আমরা তা করতে পারছি না। তাই কর আহরণের একটা চাপ রয়েই গেছে। এ চাপ থেকে মুক্তির জন্য সরকার কর আহরণের বিভিন্ন উৎস খোঁজে, যার একটি হলো অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া। আগের রাজনৈতিক সরকারের সময় এ সুযোগ ঢালাওভাবে দেয়া হতো। নৈতিকতার বিষয়টি উপেক্ষা করেই সুযোগ দেয়া হতো।

কিন্তু এভাবে অপ্রদর্শিত টাকা কখনো কি বা কতটা মূলধারার অর্থনীতিতে এসেছে?

এ সুযোগের ফলাফল খুব একটা ভালো হয়নি। বেশি টাকাও আসেনি। বরং অর্থের বড় একটি অংক পাচার হয়েছে। অপ্রদর্শিত আয়ের কোনো উৎস নেই। এটা অলিখিত আয়। অবৈধভাবে আয় করে বাইরে অর্থ প্রেরণের উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়। যার ফলে মূলধারার অর্থনীতিতে এ আয় থাকে না। তবে অনেকে বৈধ উপায়ে অর্জন করেন, কিন্তু অনেক সময় জটিলতাবশত বা অনভিজ্ঞতার কারণে অনেকেই আয়কর দিতে পারেন না। সেক্ষেত্রে ছাড় দিলে তা অনৈতিক কাজ হয় না। প্রচলিত একটা করহার নির্ধারণ করে তাদের এ সুযোগ দেয়া যায়। কিন্তু আমরা আগে দেখেছি, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে যেখানে করহারও তুলনামূলক কম ছিল। যারা বৈধভাবে আয় করে কর দিচ্ছেন, তাদের সঙ্গে হওয়া অনৈতিক কাজ এটি। বৈধ করদাতাদের প্রতি সরকারের অনৈতিক আচরণ এটি। তাই রাজনৈতিক কূটকৌশল হিসেবেও এ বিধান ভালো নয়। কারণ এ থেকে রাজস্ব আহরণ সেভাবে বাড়ে না। তার ওপর সেখানে একটি ছাপ রয়ে গেল, দোষে দুষ্ট হলো। সেজন্য এটাকে আমরা কখনই সমর্থন করি না। বৈধভাবে কেউ আয় করলে কেবল তাকে ছাড় দেয়া যায়।

সেক্ষেত্রে তো আয়ের উৎস জানাও জরুরি। কিন্তু আমরা দেখেছি আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ থাকে না। তাহলে সরকারের এ পদক্ষেপ কেন?

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া অনৈতিক পদক্ষেপ। এ থেকে খুব বেশি সুফলও আমরা পাই না। তার পরও সরকার এমন সুযোগ দেয় কোনো কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য। কেউ হয়তো চায়। আমরা দেখেছি, নানা সময়ে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণীত হয়েছে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুপারিশ মোতাবেক তাদের সুবিধা দেয়ার জন্য। বাজেটে কোথায় কর বাড়ানো হয়, কোথায় কর কমানো হয়—সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কাকে সুবিধা দেয়ার জন্য কর বাড়ানো বা কমানো হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দোষে দুষ্ট হয়ে অর্থনীতির কথা, দেশের জনগণের কথা না ভেবে নীতিমালা তৈরি করলে সেটা কল্যাণের জন্য হলো না। কোনো একটা অবৈধ কাজকে স্বীকৃতি দেয়া মানে হলো অন্যদের উৎসাহিত করা যে কয়েক বছর কর দেব না, পরবর্তী সময়ে যখন করছাড় পাওয়া যাবে তখন কর দেব।

আমাদের রাজস্ব আহরণ তুলনামূলক কম। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অদক্ষতার কথা বলে আসছেন। বর্তমানে স্থগিত থাকলেও এনবিআরকে বিভক্ত করে দুটি বিভাগে পরিণত করার অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। এ পদক্ষেপ কতটা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করছেন?

এ পদক্ষেপ বা সংস্কারের চাহিদা ও সুপারিশ অনেক দিন থেকেই ছিল। কারণ একই ব্যক্তি কর আহরণের দায়িত্বে থাকা, আবার নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও থাকা একটা স্বার্থগত দ্বন্দ্ব তৈরি করে। আমরা বরাবর বলেছি, সম্পূর্ণ অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার করে কর বিভাগের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমগুলোয়ও কর আহরণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, ঘুস দেয়া এসব খবর উঠে আসে। অনেক ধনী ব্যক্তি আয়কর দেন না। আবার অনেকেই কর বিভাগের কাজে হয়রানির শিকার হন। একটা সার্টিফিকেট তুলতে গিয়েও ঘুস দিতে হয়। এগুলো বন্ধ করার জন্য আমরা সম্পূর্ণ অটোমেশনের কথা বলছি। আর যারা রাজস্ব নীতি নির্ধারণ করবে তারা হবে আলাদা। এ ব্যবস্থা অনেক দেশেই আছে। এরই ফলাফল হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার একটা কমিটির সুপারিশমালার পরামর্শে এটা করেছে। সেটার মধ্যে কিছু জটিলতা দেখা গেছে, যার ফলে এটি বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। কিছু প্রশাসনিক জটিলতা রয়ে গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, যারা অভিজ্ঞ তাদেরকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থপনা বিভাগের দায়িত্বে না এনে প্রশাসনিক ক্যাডারদের দায়িত্বে আনা হয়েছে। এটাই মূলত প্রশাসনিক জটিলতা, যেটি দূর করা আবশ্যক। এক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাইকে মূল্যায়ন করা উচিত। যোগ্যতা ও পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি হওয়া উচিত। পরিচালনায় ঝামেলা হলে পুরো ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। তাই দায়িত্বে নিয়োগ নিয়ে আরো আলাপ-আলোচনার দরকার ছিল।

আমরা প্রায়ই দেখি বাজেটের অপচয় ও অপব্যয় হয়। বিশেষ করে আগের বাজেটের কথাই যদি ধরি। সেখানে অনেক মেগা প্রজেক্ট ছিল, অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সব মিলিয়ে তা জনসাধারণের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। বাজেটে আমরা দেখছি মহার্ঘ্য ভাতা বাড়ছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট কমানো হয়েছে। এটা একটা দ্বন্দ্ব কিনা? কিংবা রাজস্ব আয়ের কীভাবে সদ্ব্যবহার করা যায়?

হ্যাঁ, দ্বন্দ্ব তো বটেই। যেহেতু আমাদের রাজস্ব কম, ফলে বাজেট বরাদ্দ সুচিন্তিতভাবে হওয়া জরুরি ছিল। আর বরাদ্দ দিলেই হবে না, এর সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে আমাদের অনেক চাহিদা, সেখানে প্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। সেজন্য আরো সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণের দরকার ছিল। এটা করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এটা একেবারে পারফেক্টভাবে করা সম্ভব নয়। কিন্তু তার পরও প্রচেষ্টা থাকা দরকার। প্রচেষ্টার পূর্বশর্ত হলো, সত্যিকার অর্থে এটা করতে চাই কিনা। এ আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা আগের বাজেটেও দেখেছি, সেখানে প্রাধিকার দেয়া হয়েছে ভৌত অবকাঠামোয়। যুক্তিসংগতভাবেই দেয়া হয়েছে। কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন—যত বড় প্রকল্প হবে, সেখানে তত বেশি দুর্নীতি করা যাবে! সেখান থেকে ভাগবাটোয়ারা করা যাবে। অন্যদিকে শিক্ষা-স্বাস্থ্যের গুণমাণ বৃদ্ধি করতে গেলে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন করতে হবে। এর জন্য ভালো বেতন দিতে হবে। সেটা আমরা দেখছি না। সেটা করতে গেলেই আমাদের সমস্যা। এটা নিয়ে সরকারের চিন্তার অবকাশ রয়ে গেছে।

আরেকটা বিষয় হলো, মূল্যস্ফীতির চাপে সবাই জর্জরিত। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার গুরুত্ব কোথায় দিচ্ছে, কোন সময়ে গুরুত্বটা দিচ্ছে এবং সরকারের কাছে কী পরিমাণ অর্থ আছে। সরকারের কর্মচারীদের বাইরেও বিশাল জনসংখ্যা রয়েছে। তাদের বেতন বাড়ছে না এবং সেই সংখ্যাটাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির হারের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ার অর্থ হলো মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। একদিকে মূল্যস্ফীতির হার কমানোর জন্য সংকোচনমূলক নীতি নেয়া হলো, অন্যদিক সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি নেয়া হলো। এটা দ্বন্দ্বমূলক হলো।

আবার অনেক সময় দেখা যায়, বিশেষ করে রাজনৈতিক সরকারের সময় তাদেরকে আরো একটু খুশি রাখার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হতো। যেগুলো সঠিক নয়। সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত এর বাইরে যারা কর্মরত আছেন, তাদের জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া হবে সেটি ঠিক করার পর। কারণ তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করে, ব্যবসা করে। তাদের জন্য অন্যভাবে সুবিধা দেয়া যায়। যেমন শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্কলারশিপ দেয়া বা স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস কিংবা বেসরকারি খাতে আরো সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, প্রণোদনা বৃদ্ধি, যাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ঘটে। এতে বেসরকারি খাতে উৎপাদন বাড়বে। এসব পরোক্ষ সুবিধা দিতে পারলে সবার জন্য সমতাভিত্তিক, কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম হতো। কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের সুবিধা দিলে বৈষম্য চলেই আসে। যেটা সমাজের অন্য জায়গাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আরও